০৯:২৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হোটেল পর্যটক কে হুমকি গ্রেফতার সী-গালের ম্যানেজার

কক্সবাজারের তারকা হোটেল সী-গালের রেস্তোরাঁয় দেশি মুরগির নামে সোনালি মুরগি পরিবেশনের অভিযোগের প্রতিকার চান হোটেলের এক অতিথি। তার প্রতিকারের পরিবর্তে হোটেলটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (বর্তমান এলজিআরডি মন্ত্রী) সালাহউদ্দিন আহমেদের বলে পরিচিতি রয়েছে, অভিযোগ করে কোন লাভ হবে না বলে পর্যটককে হুমকি দেয়ার ঘটনায় হোটেলটির রেস্তোরাঁ ম্যানেজার মীর কামরুল হাসানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

 

 

গতকাল শনিবার (১৫ আগস্ট) রাতে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় এ ঘটনায় দণ্ডবিধির ৪১৯, ৪২০ ও ৫০৬ ধারায় থানার এসআই শুভ্র রুদ্র বাদি হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মুহাম্মদ আলী বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে পর্যটককে হুমকির ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। একই সঙ্গে হুমকি দেয়ার অভিযোগে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারও করেছে পুলিশ।

 

সূত্র জানায়, গত ৯ আগস্ট পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে আসেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার বাসিন্দা মোহাম্মদ রাসেল উদ্দিন। তিনি হোটেল সী-গালের ৭১৫ ও ৭১৭ নম্বর কক্ষে ওঠেন।
রাসেলের অভিযোগ, রাতে পরিবারের সদস্যদের জন্য খাবার খেতে হোটেলটির নিজস্ব রেস্তোরাঁয় যান। সেখানে একাধিকবার নিশ্চিত হয়ে দেশি মুরগির মাংসের অর্ডার দেন। রেস্তোরাঁর কর্মচারীরাও তাকে দেশি মুরগি দেয়ার কথা নিশ্চিত করেন।

কিন্তু খাবার পরিবেশনের পর স্বাদ নিয়ে সন্দেহ হলে বিষয়টি রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষকে জানান রাসেল। তার অভিযোগ, দেশি মুরগির কথা বলে তাদের সোনালি মুরগির মাংস পরিবেশন করা হয়েছে। রাসেলের দাবি, বিষয়টি নিয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করলে তারা সোনালি মুরগি পরিবেশনের বিষয়টি স্বীকার করেন। এমনকি তাদের হোটেলে ‘দেশি মুরগি’ হিসেবে মূলত সোনালি মুরগিই পরিবেশন করা হয় বলেও জানানো হয়।

 

ঘটনার পর রাসেল কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটকে ফোনে বিষয়টি জানান। তবে তাৎক্ষণিক প্রতিকার পাননি বলে অভিযোগ করেন তিনি। উল্টো হোটেল সী-গালের রেস্তোরাঁ ম্যানেজার মীর কামরুল হাসান তাকে ফোন করেন। রাসেলের অভিযোগ, ওই ফোনে রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে তাকে হুমকি দেওয়া হয়। রাসেল উদ্দিন বলেন, রেস্তোরাঁয় বারবার জিজ্ঞেস করার পরও তাদের মিথ্যা বলে অন্য মুরগি দেয়া হয়েছে। টাকার পরিমাণ নিয়ে তার আপত্তি ছিল না। তবে সেবার নামে খাবারের টেবিলে প্রতারণা এবং পরে রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে হুমকি দেয়ার বিষয়টি তিনি মেনে নিতে পারেননি। বিষয়টি নিয়ে, জাতীয় অভিযোগ সেলে অভিযোগ করেন তিনি।

 

অপরদিকে, জাতীয় সেলের সেই অভিযোগের বিষয়ে হোটেলটির রেস্তোরাঁ ম্যানেজার মীর কামরুল হাসানের সঙ্গে কথা বলেন সাংবাদিকরা। অভিযোগের বিষয়ে কথা বলার সময় কামরুল হাসান রাজনৈতিক প্রভাবের কথা উল্লেখ করে বলেন, আমাদের (হোটেলের) এমডির সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্পর্ক রয়েছে, তারেক জিয়ারও সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের হোটেলটা তারেক জিয়ার হোটেল নামে সবাই জানে, আপনিও হয়তো জানেন। ওই কথোপকথনের অডিও প্রকাশের পর বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অডিও প্রকাশের পর বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ের নজরে আসে। এরপর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। সূত্রের দাবি, এরই ধারাবাহিকতায় কক্সবাজার সদর মডেল থানা পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করে এবং অভিযুক্ত ম্যানেজারকে গ্রেপ্তার করে। তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সরাসরি এ ধরনের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

 

অপরদিকে, ঘটনার পরপরই অভিযুক্ত রেস্তোরাঁ ম্যানেজার মীর কামরুল হাসানকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন হোটেল সী-গাল গ্রুপের চেয়ারম্যান মাসুম ইকবাল।তিনি বলেন, ঘটনার পরপরই অভিযুক্ত ম্যানেজারকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা প্রতিষ্ঠানের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করা হয়েছে। এদিকে, শুধু হুমকির ঘটনায় মামলা নয়, খাবার পরিবেশন নিয়ে পর্যটক রাসেল উদ্দিনের করা লিখিত অভিযোগও আমলে নেয়া হয়েছে।

 

অভিযোগটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক (যুগ্মসচিব) সেবাস্টিন রেমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের নথিতে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।

 

এর আগে জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলেও অভিযোগ করেছিলেন রাসেল। তাৎক্ষণিক প্রতিকার না পেয়ে পরে সরকারের কেন্দ্রীয় অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা (জিআরএস) অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও অভিযোগ করেন তিনি। অভিযোগটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আমলে নেয়।

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয়

পতেঙ্গায় সমাজ সেবক চন্দন মহাজনের পরলোক গমন, বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের শোক

প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হোটেল পর্যটক কে হুমকি গ্রেফতার সী-গালের ম্যানেজার

আপডেটে: ০২:৩২:২২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬

কক্সবাজারের তারকা হোটেল সী-গালের রেস্তোরাঁয় দেশি মুরগির নামে সোনালি মুরগি পরিবেশনের অভিযোগের প্রতিকার চান হোটেলের এক অতিথি। তার প্রতিকারের পরিবর্তে হোটেলটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (বর্তমান এলজিআরডি মন্ত্রী) সালাহউদ্দিন আহমেদের বলে পরিচিতি রয়েছে, অভিযোগ করে কোন লাভ হবে না বলে পর্যটককে হুমকি দেয়ার ঘটনায় হোটেলটির রেস্তোরাঁ ম্যানেজার মীর কামরুল হাসানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

 

 

গতকাল শনিবার (১৫ আগস্ট) রাতে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় এ ঘটনায় দণ্ডবিধির ৪১৯, ৪২০ ও ৫০৬ ধারায় থানার এসআই শুভ্র রুদ্র বাদি হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মুহাম্মদ আলী বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে পর্যটককে হুমকির ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। একই সঙ্গে হুমকি দেয়ার অভিযোগে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারও করেছে পুলিশ।

 

সূত্র জানায়, গত ৯ আগস্ট পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে আসেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার বাসিন্দা মোহাম্মদ রাসেল উদ্দিন। তিনি হোটেল সী-গালের ৭১৫ ও ৭১৭ নম্বর কক্ষে ওঠেন।
রাসেলের অভিযোগ, রাতে পরিবারের সদস্যদের জন্য খাবার খেতে হোটেলটির নিজস্ব রেস্তোরাঁয় যান। সেখানে একাধিকবার নিশ্চিত হয়ে দেশি মুরগির মাংসের অর্ডার দেন। রেস্তোরাঁর কর্মচারীরাও তাকে দেশি মুরগি দেয়ার কথা নিশ্চিত করেন।

কিন্তু খাবার পরিবেশনের পর স্বাদ নিয়ে সন্দেহ হলে বিষয়টি রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষকে জানান রাসেল। তার অভিযোগ, দেশি মুরগির কথা বলে তাদের সোনালি মুরগির মাংস পরিবেশন করা হয়েছে। রাসেলের দাবি, বিষয়টি নিয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করলে তারা সোনালি মুরগি পরিবেশনের বিষয়টি স্বীকার করেন। এমনকি তাদের হোটেলে ‘দেশি মুরগি’ হিসেবে মূলত সোনালি মুরগিই পরিবেশন করা হয় বলেও জানানো হয়।

 

ঘটনার পর রাসেল কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটকে ফোনে বিষয়টি জানান। তবে তাৎক্ষণিক প্রতিকার পাননি বলে অভিযোগ করেন তিনি। উল্টো হোটেল সী-গালের রেস্তোরাঁ ম্যানেজার মীর কামরুল হাসান তাকে ফোন করেন। রাসেলের অভিযোগ, ওই ফোনে রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে তাকে হুমকি দেওয়া হয়। রাসেল উদ্দিন বলেন, রেস্তোরাঁয় বারবার জিজ্ঞেস করার পরও তাদের মিথ্যা বলে অন্য মুরগি দেয়া হয়েছে। টাকার পরিমাণ নিয়ে তার আপত্তি ছিল না। তবে সেবার নামে খাবারের টেবিলে প্রতারণা এবং পরে রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে হুমকি দেয়ার বিষয়টি তিনি মেনে নিতে পারেননি। বিষয়টি নিয়ে, জাতীয় অভিযোগ সেলে অভিযোগ করেন তিনি।

 

অপরদিকে, জাতীয় সেলের সেই অভিযোগের বিষয়ে হোটেলটির রেস্তোরাঁ ম্যানেজার মীর কামরুল হাসানের সঙ্গে কথা বলেন সাংবাদিকরা। অভিযোগের বিষয়ে কথা বলার সময় কামরুল হাসান রাজনৈতিক প্রভাবের কথা উল্লেখ করে বলেন, আমাদের (হোটেলের) এমডির সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্পর্ক রয়েছে, তারেক জিয়ারও সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের হোটেলটা তারেক জিয়ার হোটেল নামে সবাই জানে, আপনিও হয়তো জানেন। ওই কথোপকথনের অডিও প্রকাশের পর বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অডিও প্রকাশের পর বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ের নজরে আসে। এরপর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। সূত্রের দাবি, এরই ধারাবাহিকতায় কক্সবাজার সদর মডেল থানা পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করে এবং অভিযুক্ত ম্যানেজারকে গ্রেপ্তার করে। তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সরাসরি এ ধরনের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

 

অপরদিকে, ঘটনার পরপরই অভিযুক্ত রেস্তোরাঁ ম্যানেজার মীর কামরুল হাসানকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন হোটেল সী-গাল গ্রুপের চেয়ারম্যান মাসুম ইকবাল।তিনি বলেন, ঘটনার পরপরই অভিযুক্ত ম্যানেজারকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা প্রতিষ্ঠানের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করা হয়েছে। এদিকে, শুধু হুমকির ঘটনায় মামলা নয়, খাবার পরিবেশন নিয়ে পর্যটক রাসেল উদ্দিনের করা লিখিত অভিযোগও আমলে নেয়া হয়েছে।

 

অভিযোগটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক (যুগ্মসচিব) সেবাস্টিন রেমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের নথিতে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।

 

এর আগে জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলেও অভিযোগ করেছিলেন রাসেল। তাৎক্ষণিক প্রতিকার না পেয়ে পরে সরকারের কেন্দ্রীয় অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা (জিআরএস) অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও অভিযোগ করেন তিনি। অভিযোগটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আমলে নেয়।