চট্টগ্রামের খুচরা বাজারে প্রতি ডজন ফার্মের মুরগির বাদামি ডিম ১৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছে এবং প্রতি পিস ডিমের দাম ১৫ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে, যা সাধারণ ক্রেতাদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ সংকট ও কারসাজির কারণে এই দাম বৃদ্ধি পায়। অনুসন্ধানে জানা যায় অল্প সময়ের ব্যবধানে ডিমের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এক সপ্তাহ আগেও যে ডিমের ডজন মিলেছে ১২৫ টাকায়, সেটিই এখন চট্টগ্রাম নগরীতে কোনো কোনো বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৭৫ টাকায়। অর্থাৎ সপ্তাহের ব্যবধানে ডজনপ্রতি দাম বেড়েছে ৫৫ টাকা, যা ভোক্তাদের মধ্যে তৈরি করেছে ক্ষোভ ও উদ্বেগ।
ডিমের দাম বাড়ায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ। সাশ্রয়ী আমিষের উৎস হিসেবে নিয়মিত খাবারের তালিকায় থাকা ডিমের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার এখন প্রয়োজনের তুলনায় কম ডিম কিনছেন। কেউ কেউ খাবারের তালিকায় নিয়মিত ডিম রাখলেও এখন সেটি বাদ দিতে হচ্ছে।
গতকাল (৯ আগস্ট) সকালে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে এক ডজন ডিম সর্বনিম্ন ১৬৫-১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই হিসেবে এক হালি ডিমের দাম ৫৫-৬০ টাকায় কিনতে হচ্ছে ভোক্তাকে। এক সপ্তাহ আগেও যা ৪০ টাকায় কিনতে পাওয়া গেছে।
বর্তমানে একটি ডিম কিনতে ১৫ টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে ক্রেতাকে। এই দামে এক হালি লেবু কিনতে পাওয়া যাচ্ছে। অথচ, রমজান মাস আসলেই প্রতিবছর একটি লেবুর দামে এক হালি ডিম পাওয়া যায়। তখন লেবুর হালি ১৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়।খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, মধ্যস্বত্বভোগীর সিন্ডিকেটের কারণে বাজারে সময়ে সময়ে বিভিন্ন পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। তাদের দাবি, প্রান্তিক চাষিরা/খামারিরা যেমন ন্যায্যমূল্য পায় না, তেমনি খুচরা বিক্রেতারাও বেশি লাভ করতে পারেন না। যখনই কোনো পণ্যের দাম অস্বাভাকিভাবে বৃদ্ধি পায়, তাতে মধ্যস্বত্বভোগীরাই বেশি লাভবান হয়।
চট্টগ্রাম নগরীর বদ্দারহাট, মুদি দোকানের বিক্রেতা কলিমুল্লাহ জানান, পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন বন্যার কারণে ডিমের এই সংকট তৈরি হয়েছে। তবে, তার ধারণা কয়েক দিনে দাম এতটা বাড়ার পেছনে কেবল বন্যা দায়ী নয়। এখানে মধ্যস্বত্বভোগীর সিন্ডিকেট যুক্ত হয়েছে।
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘যদি সিন্ডিকেটই না হতো তাহলে পোলাও চালের দাম একমাসে ১৫০-২৫০ টাকায় কীভাবে এলো?’ আগ্রাবাদ কর্ণফুলী মার্কেটে ডিম কিনতে এসে দোকানির সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়াতে দেখা যায় একজন মধ্যবয়সী নারীকে। তার ধারণা, দোকানি তার থেকে বেশি দাম নিতে ৫৫ টাকা ডিমের হালি চেয়েছেন। শেষ পর্যন্ত ওই দোকান থেকে ডিম না কিনেই চলে যান তিনি।
পোলট্রি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে গেলে দ্রুত ডিমের দাম বেড়ে যায়। দেশে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার কোটি ডিমের চাহিদা রয়েছে। ফলে উৎপাদন বা সরবরাহে সামান্য ঘাটতি বাজারে বড় প্রভাব ফেলে। অবশ্য দাম বাড়ার অন্যতম আরেকটি কারণ হলো কারসাজি। খামারিরা ন্যায্যমূল্য না পেলেও মধ্যস্বত্বভোগীরা কখনোই কম লাভে ডিম বিক্রি করেন না। বরং সংকটকালীন সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন তারা। এ নিয়ে বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) মহাসচিব এম সাফির রহমান বলেন, ‘ডিমের মূল্যবৃদ্ধি মূলত জোগান ও চাহিদার ওপর নির্ভর করে। সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যার কারণে দেশের অসংখ্য লেয়ার খামারি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
বন্যায় অনেক খামারির ডিম নষ্ট হয়েছে এবং মুরগি ও ডিম ভেসে গেছে। যার ফলে বাজারে হঠাৎ করে জোগানের বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং দাম বেড়েছে।’ অবশ্য তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘খামারিরা কখনোই ভোক্তাদের দেওয়া চড়া দামের সুফল পান না। খামারিরা যে দামে বিক্রি করেন এবং ভোক্তারা যে দামে কেনেন- তার মধ্যে এক বিরাট পার্থক্য থাকে। কারণ খামারিরা সরাসরি ভোক্তাদের কাছে পণ্য বিক্রি করতে পারেন না। মধ্যস্বত্বভোগীরা এই সুযোগটি ব্যবহার করে অধিক লাভবান হন। আর দায়টা খামারিদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।
গেল জুলাই দেশের বিভিন্ন জেলায় পোলট্রি মুরগি ও ডিমের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় মহাসড়কে ডিম ভেঙে প্রতীকী প্রতিবাদ জানিয়েছেন খামারি। বিপিআইএ বলছে, খামার পর্যায়ে একটি ডিম উৎপাদনে খরচ হচ্ছে প্রায় ১০ টাকা। অথচ খামারিরা প্রায় ৬ টাকায় ডিম বিক্রি করায় প্রতিটি ডিমে ৪ টাকা লোকসান হচ্ছে। দীর্ঘ বছর ধরে খামার পর্যায়ে ডিমের দাম সমন্বয় করা হয়নি। ফলে পোলট্রি-শিল্পের মূল চালিকা শক্তি প্রান্তিক খামারিরা সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন। গেল ৫ বছরে ৬৪ হাজার খামারি এ খাত থেকে ঝরে পড়েছেন বলে দাবি সংগঠনটির।
নিজস্ব প্রতিবেদক 









