০৯:২৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মোহনগঞ্জে জমি দখল ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগে বন্ধ হওয়া প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় ফের চালু, স্থগিত চেয়ে আবেদন

নেত্রকোনা মোহনগঞ্জে নিয়োগ বাণিজ্য ও অন্যের জমি দখলের অভিযোগে ২০২০ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম আবারও শুরু হয়েছে।

 

এ অবস্থায় বিচারাধীন জমিতে বিদ্যালয়ের নির্মাণকাজ ও সব ধরনের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার আবেদন জানিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন এক ভুক্তভোগী।শনিবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিদ্যালয়ের পদাধিকারবলে সভাপতি আমেনা খাতুন অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

 

এর আগে গত ২৯ জুন ভুক্তভোগী মনিরা আক্তার শিল্পী এ অভিযোগ করেন। অভিযোগে মনিরা আক্তার শিল্পী উল্লেখ করেন, পৌরশহরের সাতুর এলাকায় ৩০ শতাংশ জমি তাঁর বাবা-মা বৈধভাবে ক্রয় করেন। বাবার মৃত্যুর পর তাঁর মা, চার বোন ও এক ভাই উত্তরাধিকার সূত্রে জমিটির যৌথ মালিক হিসেবে ভোগদখলে রয়েছেন।

 

তবে বিআরএস জরিপে ভুলবশত বা সংশ্লিষ্টদের অসাবধানতায় জমিটি তাঁদের নামে রেকর্ড হয়নি। এ সুযোগে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল হান্নান রতন ও দলিল লেখক নুরে আলম সিদ্দিকীর যোগসাজশে জাল দলিল তৈরি করে জমির মালিকানা দাবি করা হয়। পরে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে জমিটি খারিজ করে ১৫ শতাংশ জমি মোহনগঞ্জ বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়ের কাছে এবং বাকি ১৫ শতাংশ অন্যদের কাছে বিক্রি করা হয়।

 

এ ঘটনায় ২০১৮ সালের ২৬ এপ্রিল নেত্রকোনার যুগ্ম জেলা জজ, দ্বিতীয় আদালতে বাটোয়ারা মামলা (নং-১২১/২০১৮) দায়ের করা হয়। মামলায় নুরে আলম সিদ্দিকী, আব্দুল হান্নান রতন, বিদ্যালয়ের সভাপতিসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।অভিযোগকারীর ভাষ্য, মামলা চলমান থাকলেও বিবাদীপক্ষ জোরপূর্বক জমির দখল নেয়।

 

পরে জমির মূল্য ১৮ লাখ টাকা নির্ধারণ করে আদালতে ফি জমা দিয়ে স্বত্ব ঘোষণা ও বাটোয়ারা ডিক্রির আবেদনসহ সংশোধিত আরজি দাখিল করা হয়, যা আদালত গ্রহণ করেছেন। বিচারাধীন জমিতে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করা হলে মামলার নিষ্পত্তি জটিল হয়ে পড়বে এবং তাঁরা অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়বেন। তাই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই জমিতে বিদ্যালয়ের নির্মাণকাজ ও সব ধরনের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন।

 

বিদ্যালয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত “মোহনগঞ্জ বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়’ প্রথমে পৌরশহরের কলেজ রোড এলাকায় ভাড়া ভবনে পরিচালিত হতো। ২০১৯ সালে বিদ্যালয়টি সাতুর এলাকায় নিজস্ব জায়গায় স্থানান্তর করা হয়। ওই সময়ে বিদ্যালয়ের জায়গাটি অন্যের জমি দখল করে জাল দলিলের মাধ্যমে গ্রহণ করার অভিযোগ ওঠে। পাশাপাশি শিক্ষকদের কাছ থেকে নিয়োগের নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগও ওঠে। বিদ্যালয়ের জন্য কেনা জমি তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের উপজেলা শাখার সহ-সভাপতি আব্দুল হান্নান রতনের নামে নিবন্ধন করা হয়েছিল।

 

পরে তিনি জমিটি বিদ্যালয়ের নামে লিখে দিয়ে দাতা সদস্য হন এবং একপর্যায়ে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২০ সালে এসব অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে আব্দুল হান্নান রতন এফিডেভিটের মাধ্যমে দাতা সদস্য পদ থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করেন এবং সভাপতির দায়িত্বও ছেড়ে দেন। একই সময় নিয়োগ বাণিজ্য ও জমি দখলের অভিযোগে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। সম্প্রতি বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পুনরায় শুরু হওয়ায় মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সব কার্যক্রম বন্ধ রাখার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী।

 

এ বিষয়ে জানতে চাই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রব খান ঠাকুর বলেন, নানা ঝামেলায় দীর্ঘদিন বিদ্যালয়টি বন্ধ ছিল। সম্প্রতি কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। জমির সঠিক দলিল ও খারিজ আমাদের কাছে রয়েছে। যদিও জমি নিয়ে মামলা রয়েছে। তবে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চলমান থাকা জরুরি। পরে আদালতে যা রায় হবে তা আমরা মেনে নেব।

 

প্রধান শিক্ষকের দাবি- বিদ্যালয়ে শতাধিক শিক্ষার্থী ও ২৪ জন শিক্ষক ও শিক্ষা সহকারী রয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত নুরে আলম সিদ্দিকী ও আব্দুল হান্নান রতনের বক্তব্যও তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের সভাপতি ও ইউএনও আমেনা খাতুন বলেন, অভিযোগটি পেয়েছি। জমি দখল বা অন্যান্য অভিযোগের বিষয়টি জানা নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয়

পতেঙ্গায় সমাজ সেবক চন্দন মহাজনের পরলোক গমন, বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের শোক

মোহনগঞ্জে জমি দখল ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগে বন্ধ হওয়া প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় ফের চালু, স্থগিত চেয়ে আবেদন

আপডেটে: ১২:৩০:৪১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

নেত্রকোনা মোহনগঞ্জে নিয়োগ বাণিজ্য ও অন্যের জমি দখলের অভিযোগে ২০২০ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম আবারও শুরু হয়েছে।

 

এ অবস্থায় বিচারাধীন জমিতে বিদ্যালয়ের নির্মাণকাজ ও সব ধরনের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার আবেদন জানিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন এক ভুক্তভোগী।শনিবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিদ্যালয়ের পদাধিকারবলে সভাপতি আমেনা খাতুন অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

 

এর আগে গত ২৯ জুন ভুক্তভোগী মনিরা আক্তার শিল্পী এ অভিযোগ করেন। অভিযোগে মনিরা আক্তার শিল্পী উল্লেখ করেন, পৌরশহরের সাতুর এলাকায় ৩০ শতাংশ জমি তাঁর বাবা-মা বৈধভাবে ক্রয় করেন। বাবার মৃত্যুর পর তাঁর মা, চার বোন ও এক ভাই উত্তরাধিকার সূত্রে জমিটির যৌথ মালিক হিসেবে ভোগদখলে রয়েছেন।

 

তবে বিআরএস জরিপে ভুলবশত বা সংশ্লিষ্টদের অসাবধানতায় জমিটি তাঁদের নামে রেকর্ড হয়নি। এ সুযোগে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল হান্নান রতন ও দলিল লেখক নুরে আলম সিদ্দিকীর যোগসাজশে জাল দলিল তৈরি করে জমির মালিকানা দাবি করা হয়। পরে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে জমিটি খারিজ করে ১৫ শতাংশ জমি মোহনগঞ্জ বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়ের কাছে এবং বাকি ১৫ শতাংশ অন্যদের কাছে বিক্রি করা হয়।

 

এ ঘটনায় ২০১৮ সালের ২৬ এপ্রিল নেত্রকোনার যুগ্ম জেলা জজ, দ্বিতীয় আদালতে বাটোয়ারা মামলা (নং-১২১/২০১৮) দায়ের করা হয়। মামলায় নুরে আলম সিদ্দিকী, আব্দুল হান্নান রতন, বিদ্যালয়ের সভাপতিসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।অভিযোগকারীর ভাষ্য, মামলা চলমান থাকলেও বিবাদীপক্ষ জোরপূর্বক জমির দখল নেয়।

 

পরে জমির মূল্য ১৮ লাখ টাকা নির্ধারণ করে আদালতে ফি জমা দিয়ে স্বত্ব ঘোষণা ও বাটোয়ারা ডিক্রির আবেদনসহ সংশোধিত আরজি দাখিল করা হয়, যা আদালত গ্রহণ করেছেন। বিচারাধীন জমিতে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করা হলে মামলার নিষ্পত্তি জটিল হয়ে পড়বে এবং তাঁরা অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়বেন। তাই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই জমিতে বিদ্যালয়ের নির্মাণকাজ ও সব ধরনের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন।

 

বিদ্যালয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত “মোহনগঞ্জ বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়’ প্রথমে পৌরশহরের কলেজ রোড এলাকায় ভাড়া ভবনে পরিচালিত হতো। ২০১৯ সালে বিদ্যালয়টি সাতুর এলাকায় নিজস্ব জায়গায় স্থানান্তর করা হয়। ওই সময়ে বিদ্যালয়ের জায়গাটি অন্যের জমি দখল করে জাল দলিলের মাধ্যমে গ্রহণ করার অভিযোগ ওঠে। পাশাপাশি শিক্ষকদের কাছ থেকে নিয়োগের নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগও ওঠে। বিদ্যালয়ের জন্য কেনা জমি তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের উপজেলা শাখার সহ-সভাপতি আব্দুল হান্নান রতনের নামে নিবন্ধন করা হয়েছিল।

 

পরে তিনি জমিটি বিদ্যালয়ের নামে লিখে দিয়ে দাতা সদস্য হন এবং একপর্যায়ে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২০ সালে এসব অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে আব্দুল হান্নান রতন এফিডেভিটের মাধ্যমে দাতা সদস্য পদ থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করেন এবং সভাপতির দায়িত্বও ছেড়ে দেন। একই সময় নিয়োগ বাণিজ্য ও জমি দখলের অভিযোগে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। সম্প্রতি বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পুনরায় শুরু হওয়ায় মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সব কার্যক্রম বন্ধ রাখার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী।

 

এ বিষয়ে জানতে চাই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রব খান ঠাকুর বলেন, নানা ঝামেলায় দীর্ঘদিন বিদ্যালয়টি বন্ধ ছিল। সম্প্রতি কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। জমির সঠিক দলিল ও খারিজ আমাদের কাছে রয়েছে। যদিও জমি নিয়ে মামলা রয়েছে। তবে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চলমান থাকা জরুরি। পরে আদালতে যা রায় হবে তা আমরা মেনে নেব।

 

প্রধান শিক্ষকের দাবি- বিদ্যালয়ে শতাধিক শিক্ষার্থী ও ২৪ জন শিক্ষক ও শিক্ষা সহকারী রয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত নুরে আলম সিদ্দিকী ও আব্দুল হান্নান রতনের বক্তব্যও তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের সভাপতি ও ইউএনও আমেনা খাতুন বলেন, অভিযোগটি পেয়েছি। জমি দখল বা অন্যান্য অভিযোগের বিষয়টি জানা নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।